রোযা ভঙ্গের কারণসমূহ, জেনে নিন যেসব কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং যেসব কারণে রোযা নষ্ট হয় না।

Spread the love

সুপ্রিয় পাঠক! রহমত বরকত ও মাগফিরাতের মাস পবিত্র রমজান। এই মাসের ইবাদাতের মাধ্যমে বান্দা খুব সহজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রিয়পাত্র হয়ে যেতে পারে। আজকের পোস্ট থেকে আমরা জানব, রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ, যেসব কারণে রোজা নষ্ট হয়ে যায়, আধুনিক যুগের যেসব কারণে রোজা নষ্ট হয় না।

রোজা ভঙের কারণ (প্রধান দুই কারণ):
১) সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের ভিতরে কোনো কিছু ভক্ষণ করলে অথবা পান করলে অথবা গলা পর্যন্ত কোনো বস্তুর স্বাদ পৌঁছালে রোযা ভেঙে যাবে।

ছোলার চেয়ে  পরিমাণে কম এমন খাবার মুখ থেকে বের করে পুনরায় গিলে ফেললে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা ওয়াজিব হবে। (প্রমাণ : রদ্দুল মুহতার 2/ 415)

২) সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া যাবে না। সামনের রাস্তা হোক বা পিছনের রাস্তা হোক। বীর্যপাত হোক বা না হোক সঙ্গমে লিপ্ত হলেই রোজা ভেঙ্গে যাবে। তেমনিভাবে হস্তমৈথুন করে বীর্যপাত ঘটালেও রোযা ভেঙে যাবে।

আধুনিক যুগের যেসকল কাজের দরুন রোজা ভেঙ্গে যায় এবং রোজার কাযা আদায় করতে হয়:
১) রোজা অবস্থায় ডুশ নিলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। কারণ তা মলদ্বারের মাধ্যমে দেহের ভিতরে প্রবেশ করে।  মলদ্বার রোজা  ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা।(প্রমাণঃ হিদায়া 1/ 220)

২) সালবুটামোল ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। শ্বাসকষ্ট দূর করার জন্য ওষুধ টি মুখের ভিতর স্প্রে করা হয়। 

৩) সাপজিটরি ভোল্টালিন  ব্যবহার করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। অতিরিক্ত জ্বর কিংবা খুব বেশি ব্যথা দেখা দিলে  ওষুধটি মলদ্বার দিয়ে  ব্যবহার করা হয়। 

যেসব কারণে রোযা নষ্ট হয়ে যায় এবং রোজার কাযা আদায় করতে হয়:
অজু বা গোসলের সময় রোজার কথা স্মরণ থাকাবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে গলার ভেতরে পানি চলে গেলে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং শুধু কাযা করতে হবে।  (প্রমাণ ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া 3/ 378)। 

অন্যের হুমকিতে বাধ্য হয়ে রোজা ভঙ্গের কোন কাজ করলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে এবং কাযা করতে হবে। কাফফারা আদায় করতে হবে না। (প্রমাণঃ আল মাবসূত 3/98)। 

ঘাম বা চোখের পানি যদি এত বেশি পরিমাণে মুখে প্রবেশ করে যে তার গলার ভিতরে চলে যায় তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা করতে হবে।  (প্রমাণ: আল মুহিতুল বোরহানি 3/349 ইন্ডিয়া 1/203)

কোন ধরনের ধোঁয়া  ইচ্ছাকৃতভাবে ভিতরে প্রবেশ করালে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাজাও করতে হবে  (প্রমাণ: রদ্দুল মুহতার  2/395)

রোজা অবস্থায় হায়েজ নেফাস রোগ হলে রোজা ভেঙ্গে যাবে। রমাজন মাস শেষ হলে তার কাযা আদায় করতে হবে (আল মুহিত বোরহানি 1/401)

রোজার কথা স্মরণ না থাকাবস্হায় পানাহার করলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই খাবার থেকে বিরত হয়ে যেতে হবে। আর যদি বিরত না হয় তাহলে রোযা ভেঙে যাবে।

আধুনিক যুগের যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না। 
১) কানে তেল বা ড্রপ:
রোজা অবস্থায় কানের ভেতর তেল বা ড্রপ কিংবা অন্য কোন ঔষধ ব্যবহার করা যাবে এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না। তেমনি কানের ভিতর পানি চলে গেলেও রোজা ভাঙবে না। (প্রমাণ: মাজাললাতু মাজমাইল  ফিকহিল ইসলামী দশম সংখ্যা 2/444)। 

২) অক্সিজেন:
রোজা রেখে অক্সিজেন নিলে রোজা ভাঙবে না (প্রমাণ ফিকহুল নাওয়াযিল 2/300

৩) মস্তিষ্ক অপারেশন:
মস্তিষ্কে অপারেশনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভেতর কোন ঔষধ ব্যবহার করা হলেও রোজা ভাঙবে না। তেমনি ভাবে মাথার ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগালে তা মস্তিষ্কে ভেতরে চলে গেল রোজা ভাঙবে না। 

৪) পেশাবের রাস্তা দিয়ে ঔষধ প্রবেশ করানো:
পুরুষ বা মহিলার পেশাবের রাস্তায় কোন ধরনের ঔষধ বা ক্যাথেটার কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোন অস্ত্র জমা দিয়ে প্রবেশ করালো রোজা ভাঙবে না তেমনিভাবে এখানে কোন ওষুধ দিল রোজার ক্ষতি হবে না। 

৫) রক্ত দান:

রোজা অবস্থায় রক্ত দেওয়া, রোজা অবস্থায় রক্ত নেওয়া দুটোই জায়েজ। 

৬) ডায়ালাইসিস:
রোযা অবস্থায় ডায়ালাইসিস করা যাবে এর দ্বারা রোজা ভাঙ্গবে না। ( প্রমাণ:  ফিকহুল নওয়াজিল 2/300 হিন্দি 1/262

৭) ইনসুলিন:
ইনসুলিন নিলে রোজা ভঙ্গ হয় না। কারণ এটি রোজা ভঙ্গ হবার গ্রহণযোগ্য রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে না এবং গ্রহণযোগ্য খালি জায়গায় পৌঁছে না। 

৮) ড্রপ:
রোজা অবস্থায় চোখে ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয় না।

৯) এন্ডোস্কপি: 
এন্ড্রোসকপি করলে রোজা ভাঙবে না। চিকন একটি পাইপ মুখ দিয়ে ঢুকিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছানো হয়।  পাইপটির  মাথায় বাল্ব জাতীয় একটা বস্তু থাকে।  এটির অপর প্রান্তে থাকা মনিটরের মাধ্যমে রোগীর পেটের অবস্থা নির্ণয় করা হয়। সাধারণত এন্ডোস্কোপির বাল্বের সাথে কোন ঔষধ লাগানো থাকে না। তাই এন্ডোস্কোপির কারণে রোজা ভাঙবে না। তবে যদি নলে বা বাল্বে কোন ঔষধ লাগানো থাকে তাহলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।  তেমনি ভাবে টেস্টের জন্য ভিতরে পানি ছিটানো হলেও রোজা ভেঙ্গে যাবে।  (প্রমাণ: বাহরুর রায়েক 6/218   ফাতহুল কাদীর 4/ 332)

১০) ইঞ্জেকশন:
ইঞ্জেকশন নিলে রোজা ভাঙবে না। চাই তা মাংসে দেয়া হোক কিংবা রগে। কারণ যে রাস্তায় ইনজেকশন দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ওই রাস্তা রোযা ভঙ্গকারী গ্রহণযোগ্য রাস্তা নয়। (প্রমাণ: হেদায়া 1/ 220, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া 1/266) অনুরূপ রোযা অবস্থায় ভ্যাক্সিন নেয়া যাবে।

১১) স্যালাইন:
স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ স্যালাইন নেয়া হয় রগে।আর রগ রোযা ভঙ্গের গ্রহণযোগ্য ছিদ্র নয়।তবে রোজার দুর্বলতা দূর করার লক্ষ্যে স্যালাইন নেয়া মাকরূহ। 

 ১২) বমি:
অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন ব্যক্তির বমি হলে তাকে সে রোজার কাজা করতে হবে না অর্থাৎ রোজা অবস্থায় বমি হলে রোজা ভঙ্গ হবে না। (প্রমাণ: জামে তিরমিজি 153 হাদিস নং 720

১৩) তেমনিভাবে বমি মুখে এসে নিজে নিজেই ভিতরে চলে গেলেও রোজা ভাঙবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিতরে ঢুকানো যাবেনা। ( প্রমাণ: রদ্দুল মুহতার 2/ 414

১৪) দাঁতের ফাঁকের খাবার:
দাঁতের  ফাঁকে থাকা ছোলার দানার চেয়েও কম পরিমাণ খাবার গিলে ফেললে রোজা ভাঙবে না।  তবে মাকৱূহ হবে। হ্যাঁ, ছোলার চেয়ে  পরিমাণে কম এমন খাবার মুখ থেকে বের করে পুনরায় গিলে ফেললে রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাযা ওয়াজিব হবে। (প্রমাণ : রদ্দুল মুহতার 2/ 415

 
১৫) ধোঁয়া:
ধোয়া অনিচ্ছাকৃতভাবে ভেতরে চলে গেলে রোজা ভাঙবে না । তবে ইচ্ছাকৃতভাবে (সিগারেট, তামাক,আগরবাতি ইত্যাদির ধোঁয়া) ভিতরে নিলে রোজা ভেঙ্গে যাবে।(ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া 1/203)। 

 
১৬)স্বপ্নদোষ:
স্বপ্নদোষের কারনে রোজা ভাঙ্গে না। অনেকের ধারণা রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোযা নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু এটা সহীহ নয়।(প্রমাণ: আদ্দুররুল মুক্তার 2/396)। 

১৭) কুনজর কুদৃষ্টি :
কামভাবের সহিত কোন মহিলার দিকে দৃষ্টিপাতের কারণে রতিক্রিয়া ছাড়াই বীর্যপাত হলে রোজা ভাঙবে না। তবে রোযা অবস্থায় স্ত্রীর দিকেও এমন দৃষ্টিতে তাকানো অনুচিত। (প্রমাণ: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া 1/204) 

 ১৮) থুথু: 
মুখের থুথু  যত বেশিই হোক না কেন তা গিলে ফেললে রোজার কোন ক্ষতি হয় না। (প্রমাণ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী 1/199) 

১৯) পানিতে বায়ু ত্যাগ:
পানিতে বায়ু ত্যাগ করলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু অপারগতা ব্যতীত এরূপ করা মাকরুহ। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী1/ 199) 

২০) সন্তানকে দুগ্ধপান:
রোজা অবস্থায় সন্তানকে দুধ পান করালে মায়ের রোজার ক্ষতি হয় না। 

২১) ইনহেলার
রমযানের দিনের বেলায় হাঁপানির ইনহেলার নিলে রোযা ভঙ্গ হবে না।হাঁপানির ইনহেলার রোযা ভঙ্গ করবে না। কেননা সেটি সংকুচিত গ্যাস যা ফুসফুসে চলে যায়; খাদ্য নয়। রোগীর এটা সব সময় প্রয়োজন; রমযানে ও অন্য সময়ে। [বিন বাযের ফাতাওয়াদ দাওয়াহ; সংখ্যা- ৯৭৯] এবং দেখুন: “রোযার সত্তরটি মাসয়ালা” শীর্ষক পুস্তিকা।

প্রিয় পাঠক, এ প্রবন্ধ থেকে কতটুকু শিখেছেন সে বিষয়ে নিজেকে পরীক্ষা করে নিন!

১) কোন কোন কারণে রোজা ভেঙে যায়?
২)ইনহেলার ব্যবহার করলে রোযা নষ্ট হবে কিনা?
৩)সাপজিটারি ভোল্টালিন ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হবে কিনা?
৪)ধোঁয়া প্রবেশ করলে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
৫)কানে ড্রপ দিলে রোজা নষ্ট হবে কিনা?
৬)অক্সিজেন নিলে রোযা নষ্ট হবে কিনা?
৭)প্রশ্রাবের রাস্তা দিয়ে ক্যাথেটার ঢুকালে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
৮)রোজা রেখে রক্ত দেয়া যাবে কিনা?
৯)রোজা রেখে রক্ত নেয়া যাবে কিনা?
১০) রোজা অবস্থায় ইনসুলিন ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হবে কিনা?
১১) চোখে ড্রপ দিলে রোজার ক্ষতি হবে কিনা?
১২) এন্ডোস্কপি করলে রোজা নষ্ট হবে কিনা?
১৩)ইঞ্জেকশন দিলে রোজা নষ্ট হবে কিনা?
১৪) স্যালাইন দিলে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
১৫)রোজাবস্হায় বমি হলে রোযা নষ্ট হবে কিনা?
১৬)স্বপ্নদোষ হলে রোযা নষ্ট হবে কিনা?
১৭) থুথু গিলে ফেললে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
১৮) বাচ্চাকে দুধ পান করালে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?
১৯) রোযা ভঙ্গের প্রধান দুই কারণ কি
২০) ভুলে কিছু খেলে অথবা পান করলে কি রোজা ভঙ্গ হবে কিনা?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

RECENT POST

RELAED POST