রোজার নিয়ত বাংলা, নিয়তের মাসআলা, নিয়ত ছাড়া কি রোজা হবে?

Spread the love

প্রিয় দ্বীনি ভাই/বোন, রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দার জন্যে অত্যান্ত মূল্যবান একটি উপহার। অনেক বড় একটি নেয়ামত। যে ব্যক্তি উক্ত উপহার ও নেয়ামতের কদর করতে পারবে সেই হবে সফল। আজকের পর্বে আমরা আপনাকে রমজান মাসের রোজার নিয়তের মাসালা মাসায়িল সম্পর্কে ধারণা দেব। রোজার বাংলা নিয়ত। রোজার নিয়ত কি মুখে বলতে হয়? রোজার নিয়ত কখন করতে হয়? নফল রোজার নিয়ত কি? রাতে রোজার নিয়ত করতে না পারলে কি করবে ইত্যাদি।

নিয়তের মাসআলা
প্রশ্নঃ রোজা রাখতে কি রোজার নিয়ত করা লাগবে?
উত্তরঃ হ্যাঁ। অবশ্যই রোজার জন্যে রোজার নিয়ত লাগবে। নিয়্যাত ছাড়া রোযাই হবে না। হাদীস শরীফে আছে ‘সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল (প্রমাণ সহি বুখারী ১)।

রোজার নিয়তের জরুরি মাসায়েল:
ক) রোজার নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত মানে সংকল্প করা, ইচ্ছা করা। যেমন মনে মনে সংকল্প করা যে, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আগামীকালের রোজা রাখছি’। রোজার আরবী নিয়ত করা জরুরি নয়। রোজার নিয়ত বাংলায় করলে কোনো সমস্যা নেই।

নফল রোজা হলেও এমন বলবে। আর মান্নতের রোজা হলে মান্নতের কথা উল্লেখ করবে।কাযা রোজা হলে কাযার নিয়ত করবে। কাফফারার রোজা হলে কাফফারার নিয়ত করবে।

রোজার নিয়ত মুখে বলা জরুরী নয়। মনে মনে করলেও যথেষ্ট। শুধু রোজার নিয়ত নয় যে কোনো নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়। নিয়তের সম্পর্ক অন্তরের সাথে। তবে মুখে বল্লেও সমস্যা নেই।

প্রশ্ন: পুরো রমজানের নিয়ত একদিন একসাথে করে নিলে হবে কি?
উত্তর: পুরো রমজানের জন্য একত্রে নিয়ত করা যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যেক রোজার জন্যে পৃথক পৃথক নিয়ত করতে হবে। কারণ প্রতিটি রোজা ভিন্ন ভিন্ন আমল। আর প্রতিটি আমলের জন্যই পৃথক নিয়ত করা জরুরি। (প্রমাণ: সহি বুখারী 1/2)

• রমজানের রোজা, নির্দিষ্ট দিনের মান্নতের রোজা এবং নফল রোজার নিয়ত রাত্র থেকে অর্ধ দিনের পূর্ব পর্যন্ত করা যাবে অন্যসব রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পূর্বে করা আবশ্যক। (প্রমাণ: সহিহ মুসলিম 1/36) অর্থাৎ রমজানের রোযার নিয়ত রাতের করতে ভুলে গেলে সকাল এগারোটার মধ্যে করা যাবে।

• রমজানের কাযা রোজা ও কাফফারার রোজা এবং অনির্দিষ্ট মান্নতের রোজা এবং নফল রোজার নিয়ত রাত্রে করতে হবে। দিনে করলে হবেনা। (প্রমাণ: হেদায়া 1/213)

• রমজান মাসে যেকোনো রোজার নিয়ত করুক না কেন তাহা রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হবে। রমজান মাসে অন্য কোন প্রকারের রোজা রাখলে সেই রোজা হবে না। রমজানেরটাই আদায় হবে।

• কেউ যদি সাহরী খেয়ে নেবার পর রোজার নিয়ত করে ফেলে কিন্তু তখনো সাহরীর সময় শেষ হয়নি এমতাবস্থায় রাতে রোজার নিয়ত করলেও সুবহে সাদিক পর্যন্ত তথা সাহরীর সময় শেষ হবার আগ পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী মিলনের অবকাশ থাকে। এতে নিয়তের কোন ক্ষতি হবে না। (প্রমাণ : সূরা বাকারা 187) অর্থাৎ নিয়ত করার পর সাহরীর সময় যদি আরোও বিশ মিনিট অবশিষ্ট থাকে তাহলে আপনি পানাহার ও স্ত্রী সহবাসও করতে পারবেন নতুন করে নিয়ত করতে হবে না।

গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন:
প্রশ্ন: রােযা দ্বারা কিভাবে মানুষ পাপ থেকে বিরত হয়? রােযা দ্বারা কিভাবে সংযমী হওয়া যায়?

উত্তর: এটা বােঝার জন্য আগে বুঝতে হবে গােনাহ্ কিভাবে হয়। সাধারণতঃ মানুষের গােনাহ হয় পেটের কারণে অথবা যৌনাঙ্গের কারণে। অধিকাংশ গােনাহের সম্পর্ক হয় পেটের সাথে অর্থাৎ খাওয়া – দাওয়ার সাথে কিংবা যৌন বিষয় সংক্রান্ত। রােযা রাখার মাধ্যমে এই দুটোকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস গড়ে তােলা হয়। রােযা দ্বারা শুধু যে পানাহার এবং যৌন ব্যবহারকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় তা নয়, সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কারণ সমস্ত অঙ্গ – প্রত্যঙ্গের গােনাহ থেকে বিরত থাকলেই রােযা পূর্ণাঙ্গ হয়, মুখের দ্বারা যত গােনাহ হতে পারে সেই সব গােনাহ থেকে যদি বিরত থাকা হয়, চোখের দ্বারা যত গােনাহ হয় তা থেকে যদি বিরত থাকা হয়, কানের দ্বারা যত গােনাহ হয় তা থেকে যদি বিরত থাকা হয়, এভাবে সমস্ত অঙ্গ – প্রত্যঙ্গ থেকে যত গােনাহ হতে পারে সেসব থেকে যদি বিরত থাকা হয়, তাহলেই হয় পূর্ণাঙ্গ রােযা।

হাদীস: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেনঃ রসুল (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করতে পারলনা, তার রােযা রেখে পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়ােজন নেই। (বােখারী)

দেখা গেল, পূর্ণাঙ্গ রােযা যদি আমি রাখতে চাই, তাহলে সারা মাস আমাকে সব ধরনের গােনাহ থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে, না থাকলে আমার রােযা পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না। বরং সেটা হচ্ছে ছেড়া ফাঁটা রােযা, ভাঙ্গা – চোরা রােযা। হাদীছে রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘রোযা হল ঢাল স্বরূপ,যতক্ষণ এই ঢালকে ফেড়ে দেয়া না হয় ‘। এখানে বােঝানাে হয়েছে যে, ঢাল দ্বারা যেমন মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারে, তদ্রপ বােয়া দ্বাৰাও মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারে। ঢাল দিয়ে আত্মরক্ষা হয় শত্রুর আক্রমন থেকে, আর রােযা দ্বারা আত্মরক্ষা হয় গােনাহ থেকে এবং জাহান্নাম থেকে। তবে ঢাল দ্বারা মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারে যদি ঢাল ঠিক থাকে, কোন ফারা-ছেড়া যদি না থাকে, কোন ছিদ্র যদি না থাকে। ফাঁটা ছেড়া থাকলে সেই ঢাল দ্বাৱা আত্মরক্ষা করা যায় না।

তদ্রুপ রোযা দ্বারাও আত্মরক্ষা হবে যদি রোযা সহীহ্ সালেম থাকে,যদি রােযা আস্ত থাকে। রােযা যদি ফেড়ে-চিরে যায়, তাহলে সেই রােজা দ্বারা আত্মরক্ষা হবে না। এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ ! রােজা আবার কি করে ফেড়ে চিরে যায়? অর্থাৎ রােযা যে ঢাল, এই ঢাল আবার কিভাবে ফেড়ে -চিরে যায়? নবী ( সাঃ ) বললেন : মিথ্যা এবং গীবত দ্বারা। অর্থাৎ, যদি মিথ্যা বলা হয় , যদি গীবত করা হয়, গালমন্দ করা হয় তাহলে এগুলাের দ্বারা রােযা যে ঢাল, এই ঢাল ফেড়ে চিরে যায়, আর আস্ত থাকে না। এখানে মুখের দ্বারা যে দুটো বড় গােনাহ হয় অর্থাৎ মিথ্যা বলা এবং গীবত করা এদুটোর কথাই বলা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা যত গােনাহ হয় সব থেকে বিরত থাকতে হবে। বিরত না থাকলে রোযা ভাল থাকবে না। এভাবে সব গােনাহ থেকে বিরত থাকলে এই এক মাসেই গােনাহ থেকে বিরত থাকা এবং গােনাহ মুক্ত জীবনযাপন করার একটা অভ্যাস গড়ে উঠবে।এভাবে একটা পবিত্র জীবনের সূচনা করাই হল রােযার উদ্দেশ্য।

সুতরাং আসুন রমজানের রোজার গুরুত্ব বুঝে রোজা পালন করি। নিজের আমল ইমান সমৃদ্ধ করি। আজকের পোস্ট থেকে আশা করি রোযা রাখার নিয়ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RELAED POST