বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, উবায়দুর রহমান খান নদভী

Spread the love

প্রিয় পাঠক বন্ধু! আজকের এই পোষ্ট থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার ইতিহাস জানতে পারবেন। বাংলাদেশে কিভাবে মাদরাসা ও কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হল কার মাধ্যমে হল, এছাড়াও সংশ্লিষ্ট অনেক তথ্য জানতে পারবেন। বিশেষ করে যা জানতে পারবেন—
• সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে সুলতানুল আউলিয়া দিল্লির খাজা নিজামুদ্দীনের কোন খলীফার মাজার রয়েছে?

• ঢাকার সিদ্দিক বাজার কার নামে নামকরণ হয়? দেওয়ানবাগ গ্রাম কার নামে নামকরণ হয়? আহসান মঞ্জিল কার নামে নামকরণ হয়।?

•দারুল উলুম দেওবন্দ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়? উপমহাদেশে ইংরেজরা কত হাজার আলেমকে হত্যা করে ও কত হাজার আলেমকে ফাঁসিতে ঝোলায়?

• মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী ঢাকার কোন মসজিদে এতেকাফ করেছেন?
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী কত সালে কোন নবাবের আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন?

• আশ্রাফ আলী থানভী রহ: নবাবকে কয়টি শর্ত দিয়েছিলেন? সে শর্তগুলো কী কী? থানভী রহ: নবাবকে কত রুপি দিয়েছিলেন?

• হযরত থানভীর কোন তিন খলীফা আধুনিক ঢাকায় ইসলামী নবজাগরণের সূচনা
করেন? কত সনে ঢাকায় মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়?

• লালবাগ মাদ্রাসার সূচনা কখন? বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসাটি ‘দেওবন্দ মাদ্রাসা’ নামে খ্যাত? ফরিদাবাদ মাদ্রাসার ইতিহাস ঐতিহ্য ও বাংলাভাষার সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় পত্রিকা কোনটি?

• বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পঁচিশ বছর পর্যন্ত কোন মাদ্রাসায় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে?

• বাংলাদেশে প্রথম দেওবন্দী মাদরাসা কোনটি? ১২৭০ খ্রীষ্টাব্দে হাদীসের বড় দরসগাহ কোথায় ছিল? এছাড়াও অনেক ধরনের তথ্য আপনি জানতে পারবেন এ প্রবন্ধ থেকে।

বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

লিখেছেন: মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী হাফিজাহুল্লাহ


অতীত যেমন অতীত হয়ে গেছে বর্তমানও কিছুক্ষণ পর আর থাকবে না,অতীত হয়ে যাবে। আজ যে সময়টিতে আমরা অবস্থান করছি, খুব দ্রুতই সেটি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। সময় থেমে থাকে না। কথায় বলে, সময় এবং স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ২০২২ ইং সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার যে চিত্র তা অতীতের তুলনায় অনেক ভিন্ন। ভবিষ্যতেও যা বহু বিচিত্র রূপ ধারণ করবে। আমরা বর্তমানটিই দেখতে পাচ্ছি। ভবিষ্যৎ কতটুকু দেখতে পাব জানি না। দূর অতীতও আমাদের প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়নি। ইতিহাস আমার পছন্দের বিষয়। এর সাথে আমার প্রকৃতিগত সম্পর্ক। কিছু পড়ে কিছু শুনে আর বাকিটা উপলব্ধি থেকে আমি বুঝতে পারি। কখনো মনে হয়, ইতিহাসের নানা উপকরণ আমার সাথে কথা বলে।
অতীতের প্রাচীন নিদর্শন বা ধ্বংসাবশেষ, আলো-বাতাস ও প্রকৃতি আমার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয়কে কিছু ইঙ্গিত দেয়।

হাজার বছর আগের ঢাকা আমার কল্পনায় স্পষ্ট। আমি ধারণা করতে পারি,
আটশো বছর আগের ঢাকা সম্পর্কেও যখন দিল্লির খাজা নিজামুদ্দীন সুলতানুল আউলিয়ার খলীফা হযরত শায়খ শরফুদ্দীন চিশতী রহ. ঢাকায় এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে যার মাজার। সুলতানী ও পাঠান আমলের ঢাকার চারশো বছর মনে হয় আমি চোখে দেখেছি। এ অঞ্চলের জলবায়ু, প্রাণ ও প্রকৃতি, ইতিহাস ও সমাজ-বিবর্তন আমাকে বুঝতে সাহায্য করে।

১৬০৮ থেকে ১২ ইংরেজি সালের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমার পূর্বপুরুষ পাঠান নৃপতি হযরত খাজা
ওসমান খান রহ. কত বেদনা ভরেই না ঢাকা ছেড়ে ভাটি অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন। ঢাকার নামকরণ, ইসলামী পরিবেশ, মসজিদ, মাদরাসা ও এ শহরের আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য তার মতো দরবেশ শাসকদেরই কৃতিত্ব।
এ পর্যায়ে মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ (কার্জন হলের সামনে বাগে মুসায় যিনি শায়িত) পৌত্র দেওয়ান মুনাওওয়ার খাঁ (যাঁর আধ্যাত্মিক উপাধি সিদ্দীক, ঢাকার সিদ্দীক বাজার যার নামে, দেওয়ানবাগ গ্রামটিও তাঁরই নামে) এর নাম ও অবদান সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ঢাকার ইসলামী বৈশিষ্ট্য ও
আধ্যাত্মিক চরিত্র বিনির্মাণে এদের ভূমিকার কোনো তুলনা হয় না।

১৬১২ থেকে পরের চারশো বছর ঢাকা যে চড়াইউতরাই, আনন্দ-বিষাদ, জাঁক-জৌলুস প্রত্যক্ষ করেছে সেসবও আমার কাছে স্পষ্ট। অবশ্য শেষ চারশো বছর অনেকটাই প্রামাণিক। বিশেষ করে মোঘল শাসনযুগের ঢাকা নবাব ইসলাম খাঁ, শাহযাদা আজিমুশশান, মীর জুমলা, নবাব শায়েস্তা খা
প্রমুখের কীর্তিতে সাজানো।

১৭৫৭ সালে বাংলার ভাগ্যাকাশে যে বিপর্যয়
নেমে আসে মুর্শিদাবাদের পাশাপাশি ঢাকাও ছিল এর সমান অংশীদার। মীর বাকের, আগা সাদেক সে ট্রাজেডিরই শিকার। এর একশো বছর পর সিপাহী বিপ্লবে (১৮৫৭) ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ছিল প্রবাদতুল্য। মধ্যবর্তী শত বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনেও ঢাকার অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিপ্লবের সময় ঢাকার টঙ্গী, বংশাল, বাদামতলী (আদি ঢাকার কেন্দ্রবিন্দু) ও জিনজিরার (জাযিরা) আলেম-উলামা ও মুজাহিদদের কীর্তিগাথা স্মরণীয় হয়ে আছে।

চট্টগ্রামের চুনতির মাওলানা আব্দুল হাকিম, মিরশ্বরাইয়ের সুফী নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী, নোয়াখালীর মাওলানা ইমামুদ্দীন, মোমেনশাহীর গাজী আশেক উল্লাহ (ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাহেবের পরদাদা) প্রমুখের মতো ঢাকার বংশালের হাজী বদরুদ্দীনও ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর ঢাকায় ব্রিটিশ শাসনের কৌশলী আবর্তে মুসলিম প্রাধান্য হ্রাস পায়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজআনুকূল্যে অন্য সম্প্রদায় ঢাকায় জেঁকে বসে। ব্রিটিশরা কলোনি করে, আর্মেনীয়রা বাসা বাঁধে, আশপাশের এলাকা থেকে হিন্দু মহাজনরা ঢাকায় এসে প্রতিষ্ঠিত হয়। গড়ে ওঠে লক্ষ্মীবাজার, শ্যামবাজার। এর আগে ঢাকা বলতে বাদামতলী, নবাবপুর, ইসলামপুর ও সদরঘাটকেই বোঝাত।

১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর থেকে পরিণত হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানীতে। অবশ্য ফ্রান্সের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঢাকার মুসলিম ব্যবসায়ী খাজা আহসানুল্লাহ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও
সম্পত্তি কিনে নিয়ে এর বহু বহু পূর্বেই এক নতুন আবহের সৃষ্টি করেন।

১৬১২ সালের বড়কাটারা, ছোটকাটারা, লালবাগ কিল্লা ছাড়া মোঘল রাজধানী ঢাকায় মোঘলদের তেমন কিছু কীর্তি দেখা যায় না। যদিও সুলতানী ও মোঘল আমলের অসংখ্য মসজিদ ঢাকার শোভা বর্ধন করত। ফরাসি বণিক মিস্টার খোজার তৈরি প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা (যা ক্রয় করার পর খাজা আহসানুল্লাহ নাম দেন আহসান মঞ্জিল) ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপনা ঢাকায় ছিল না। তবে ঢাকার মোঘল স্থপতি ইসলাম খাঁ চিশতীর সময় থেকেই নবাব বাড়ি ও
আগে মসজিদভিত্তিক মাদরাসা। সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত
হয় ঢাকার ইসলামিয়া মাদরাসা। এ রকম আরও কিছু মাদরাসা কাছাকাছি সময়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কিছু অংশ ব্রিটিশ যুগে স্কুল-কলেজে রূপান্তরিত হয়ে যায়। যেমন, আরমানীটোলা হাম্মাদিয়া স্কুল। এটা
ছিল হাম্মাদিয়া মাদরাসা।

এ দেশের দীর্ঘ ১৪০০ বছরের ইসলামী সমাজ-সংস্কৃতি ও প্রায় ১০০ বছরের ইসলামী রাষ্ট্র ও প্রশাসন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের হুমকির মুখে বিজাতীয় সংস্কৃতি যখন মুসলিম সমাজের স্বকীয়তা গ্রাস করে নিচ্ছিল প্রায়
তখন বাংলার অধপতিত মানুষকে মুক্তি ও আদর্শের পথ দেখানোর জন্য আধুনিক সময়ের উলামা-মাশায়েখগণ কঠিন আত্মত্যাগে ব্রতী হন। সিপাহী বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর যখন উপমহাদেশে ইংরেজরা প্রায় পঞ্চাশ হাজার আলেমকে হত্যা করে এবং চৌদ্দ হাজার আলেমকে ফাঁসিতে ঝোলায় তখন বাংলার আলেমরাও নিজেদের জান ও মালের কোরবানী পেশ করেন। বিপ্লব
ব্যর্থ হওয়ার নয় বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইসলামের অনন্য দুর্গ দারুল উলূম দেওবন্দ (৩০ মে ১৮৬৬)। নতুন এ রেনেসাঁর প্রভাব ঢাকায় এসে পড়ে। ১৯২০ সালে ইসলামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর দেওবন্দের
প্রথম দিককার ছাত্র লক্ষ্মীপুর রায়পুরের মাওলানা শায়খ আব্দুল্লাহ ঢাকায় উলামায়ে দেওবন্দের প্রতিনিধিত্ব করেন। মক্কা শরীফ থেকে আগত কলকাতা-প্রবাসী হাফেয মোহাম্মদ তোয়াহা মক্কী ঢাকায় নবাব বাড়ির ইমাম হয়ে আসেন। ঢাকার নবাব সলীমুল্লাহ তাকে বিয়ে করান লক্ষ্মীপুরে। নবাব
নিজেও এ বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে লক্ষ্মীপুর যান। মাওলানা আব্দুল্লাহ নিজ বাড়িতে দিল্লি জামে মসজিদের আদলে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৮৮০ সালে অর্থাৎ দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর মাওলানা আব্দুল্লাহ
রায়পুরী প্রতিষ্ঠিত এ মসজিদে তরুণ বয়সে মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানীসহ অনেকেই এতেকাফ করেছেন। মাওলানা মাদানী বাংলাদেশে তার পিতৃতুল্য মাওলানা আব্দুল্লাহকে চাচা বলে ডাকতেন। রায়পুরের এই শায়খ আব্দুল্লাহ সাহেবের বাড়িতে উজানীর কারী ইবরাহীম সাহেব ও মোহম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর বিয়ে করেছেন।

এই মসজিদের তেহখানা বা ভূগর্ভস্থ
এবাদতখানায় উপমহাদেশের বহু বুযুর্গানে দীন চিল্লা পালন করেছেন। এরপর হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর আগমন ঘটে। ঢাকার নবাব সলীমুল্লাহ ছিলেন থানভী সাহেবের ভক্ত। হাকীমুল উম্মত
থানভীর অসাধারণ আত্মমর্যাদাবোধ ও কঠোর ইসলাহী শতাবলির প্রতি পূর্ণ
শ্রদ্ধা পোষণ করেই নবাব সলীমুল্লাহ তাকে ঢাকায় আনতে সক্ষম হন।

যুগের মুজাদ্দিদ হযরত হাকীমুল উম্মত যেসব কড়া শর্ত নবাব সাহেবকে দিয়েছিলেন তার মধ্যে তিনটি খুবই লক্ষণীয়—
এক. নবাব তাকে কোনো হাদিয়া দিতে পারবেন না।

দুই. হযরত থানভীকে তার প্রাসাদে যেতে বলতে পারবেন না।

তিন. সাধারণ মজলিসে নবাব শরীক হবেন। একাকী থানভী সাহেবের সাথে

এমন অনেক শর্ত মেনেই নবাব সলীমুল্লাহ যখন থানভী সাহেবকে ঢাকায় আনেন তখন থেকেই বাংলাদেশে নতুন রেনেসাঁ যুগের সূচনা হয়। হযরত থানভী রহ. দীনি কাজের জন্য নবাব সাহেবকে দুশো টাকা দিয়ে বলেন,
ঢাকাকে তার পুরোনো ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিতে কাজ করে যান। উল্লেখ্য যে, এ শহরেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর চল্লিশের দশকে হযরত থানভীর তিন খলীফা আধুনিক ঢাকায় ইসলামী নবজাগরণের সূচনা
করেন। এরা হলেন হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী সদর সাহেব হুযুর, মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব পীরজি হুযুর ও মাওলানা মোহম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুযুর রহ.। প্রথমে তাঁরা সূত্রাপুরে একজন দীনদার মানুষের সহায়তায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার শুরু করেন। এরপর হাফেয হুসাইন নামক এক ব্যক্তির
ওয়াকফকৃত জায়গায় শুরু করেন হুসাইনিয়া আশরাফুল উলূম মাদরাসা।

মুসলিম শাসন আমলের ঐতিহ্য বড়কাটারা তাঁরা দীনি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আবাদ করেন। বড়কাটারা থেকে এ দেশের প্রথম প্রজন্মের উলামায়ে কেরাম ফারেগ হন। যেমন, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক, আমার মাতামহ মোমেনশাহীর মাওলানা আশরাফ আলী বড় হুজুর প্রমুখ। যারা বহু মসজিদ মাদরাসা গড়ে তোলেন। পীরজি হুযুর ছিলেন এর মুহতামিম।

পাকিস্তান হওয়ার পর ১৯৫০ সালে সদর সাহেব হুযুর লালবাগ মাদরাসা শুরু করেন। কথা ছিল লালবাগ দুর্গটি মাদরাসা হিসেবে পাওয়া যাবে। নাম রাখা হয় জামিয়া কোরআনিয়া। কিন্তু আইউব খানের সম্মতি না হওয়ায় লালবাগ কিল্লা পতিত পড়ে থাকে। কেবল শাহী মসজিদ ও সংলগ্ন ছোট্ট
ভবনটিই মাদরাসা হিসেবে পাওয়া যায়। এর আগে ১৯৪২ সালে আধুনিক ইসলামী জাগরণের সূতিকাগার কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়া গড়ে ওঠে। হযরত থানভীর আরেক খলীফা মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতহার আলী রহ, আমার পিতামহ ও তার খলীফা আল্লামা আহমদ আলী খান রহ. এর
অতুলনীয় সহযোগিতায় এটি প্রতিষ্ঠিত করেন।

১৯৪৫ সালে এটি বাংলাদেশের দেওবন্দ নামে আখ্যায়িত হয়। দাদাজী দীর্ঘ ৪২ বছর এর প্রিন্সিপাল ও কার্যকরী রূপকার হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন।
ওদিকে ময়মনসিংহ শহরে ১৯৪৫ সালেই আমার মাতামহ হযরাতুল আল্লাম মাওলানা আশরাফ আলী রহ. কিছু সঙ্গী সাথী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ময়মনসিংহ চরপাড়া জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদরাসা। নানা
ছিলেন বড় কাটরায় শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রং এর সহপাঠী। আধ্যাত্মিকতার লাইনে তিনি ছিলেন খুবই অগ্রসর এবং হযরত মাও. জাফর আহমাদ উসমানী রহ. এর খলীফা। বাংলাদেশে তাবলীগী জামাত যেসব আলেম প্রথম দিল্লি থেকে নিয়ে আসেন, নানা ছিলেন তাদের
অন্যতম। দেশে বিদেশে তিনি বহু সাল লাগিয়েছেন। বর্তমানে নানার মাদরাসার চত্বরেই শাইখুল ইসলাম মুজাহিদে মিল্লাত হযরত মাও. আতহার আলী রহ. এর কবর।

লালবাগের কিছু দিন পর ১৯৫৬ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে পোস্তগোলা শ্যামবাজারের মাঝামাঝি মিলব্যরাকের পাশে একখন্ড
ওয়াকফকৃত জায়গায় সদর সাহেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় ফরিদাবাদ মাদরাসা। পূর্ণ নাম, জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম। এখলাস ও কোরবানীর ওপর প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসাটি খুব নীরবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। ইসলামী শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং দাওয়াতী ও ইসলাহী কার্যক্রম প্রসারে ফরিদাবাদ মাদরাসার অবদান ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এর বহু পর হাফেজ্জী হুযুর প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া নূরিয়া
কামরাঙ্গীর চর। এরপর ঢাকাসহ সারা দেশে হাজারো মাদরাসা গড়ে উঠতে থাকে।

ফরিদাবাদেই এ দেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা সুফলদায়ী ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইদারাতুল মাআরিফ কায়েম হয়। মাওলানা আতহার আলী, মাওলান নূর মুহাম্মদ আজমী, মাওলানা আতাউর রহমান খান, মাওলানা
মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রহ. নিজ সদিচ্ছা, মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি আলোকিত করেন। ষাটের দশকে এ প্রতিষ্ঠান থেকে বহু আলেম, লেখক, অনুবাদক ও গবেষক তৈরি হন। আজকের বাংলাদেশেও প্রবীণ লেখক, অনুবাদক ও গবেষক আলেমদের অনেকেই নিজেকে ইদারাতুল মাআরিফের শিক্ষার্থী, সদস্য বা সাথী বলে গর্ববোধ করেন।

বর্তমানে বাংলাভাষার সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় পত্রিকা মাসিক নেয়ামত ফরিদাবাদ থেকেই তার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। প্রায় আশি বছর যাবৎ নানা পর্বে প্রকাশিত নেয়ামত পত্রিকা বাংলাদেশে প্রমিত ইসলামী ভাবধারা
শিক্ষা প্রচারে পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। ফরিদাবাদ কর্তৃপক্ষ বাংলা ভাষা সাহিত্য সাংবাদিকতায় নতুন আলেম প্রজন্মকে যোগ্যতর হিসেবে গড়ে তুলতে ইদারাতুল মাআরিফের আদলে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান চালুর চিন্তা ভাবনা করছেন। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়
যে, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে পঁচিশ বছর পর্যন্ত ফরিদাবাদ মাদরাসায় ছিল। নিজস্ব জায়গা হওয়ার আগ পর্যন্ত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া ফরিদাবাদের ভবনে তার কাজ চালিয়ে যেতে হয়। বেফাকের প্রথম তিন মেয়াদ আমার আব্বা মাওলানা আতাউর রহমান খাম যখন এর মহাসচিব ছিলেন তখন ফরিদাবাদই ছিল বেফাকের সদর দপ্তর। উল্লেখ্য, বেফাকের মহাসচিবের পাশাপাশি একসময় তিনি ফরিদাবাদের মুহতামিমও ছিলেন। পরবর্তীতে আজীবন বেফাকের অন্যতম সিনিয়র সহ সভাপতি ও ফরিদাবাদের সদরে মুহতামিম ছিলেন।

বাংলাদেশে প্রথম দেওবন্দী মাদরাসা আমাদের জানামতে মৌলভীবাজার
জেলার বড়লেখা থানার বড়খলা বশীরিয়া মাদরাসা। এরপর ১৯০১ সালে হাটহাজারী, ১৯১৫ সালে বি বাড়ীয়া জামিয়া ইউনুসিয়া, ১৯২০ সালে ঢাকার নবাব বাড়ী ইসলামীয়া মাদরাসা উল্লেখযোগ্য। এসবের বহু আগে হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রামে শায়েখ মাজদুদ্দিন ইরাকী রহ. এককভাবে দীনি শিক্ষা চালু
রাখেন। আমার প্রপিতামহ আল্লামা ইবারত খান রহ. এ প্রতিষ্ঠান ও শায়েখের ছাত্র। এর আগে প্রতি শতকের ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় শায়েখ এদেশের আনাচে কানাচে দীনি শিক্ষা কেন্দ্র কায়েম করেন। ১২৭০ খ্রীষ্টাব্দে
হাদীসের বড় দরসগাহ ছিল সোনার গাঁয়ে। শায়েখ ছিলেন, বুখারা থেকে আগত হযরত শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা রহ.। এর আগে বঙ্গ বিজয়ী ইখতিয়ার মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী বাংলার স্থানে স্থানে মাদরাসা
কারেম করেন। এটিই স্বাধীন মুসলিম বাঙলার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা। কালান্তরে যা কওমী মাদরাসার রূপ নিয়েছে। মালদা, দিনাজপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে শত শত মাদরাসা ও
যানাকাহ ছিল, যাতে পৃথিবীর বহু দেশের ছাত্ররা পড়তে আসতো। বেশিরভাগ শায়েখ ছিলেন মধ্য এশিয়ার নকশেবন্দী তরীকার অনুসারী। এরপর চিশতীয়া, সাবেরীয়া তরীকা ওলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে
উঠে। পাশাপাশি কাদেরী, নকশেবন্দী, মোজাদ্দেদী তরীকাও প্রচলিত আছে।
উত্তর ও পশ্চিম বাংলাদেশের দরসবাড়ী খ্যাত মাদরাসাটি সে যুগের পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টান্ত ছিল। যার মাশায়েখগণের মধ্যে হযরত জাহাঙ্গীর বিমনানী, আখি সিরাজ, শায়েখ আলাউদ্দিন আলাউল হক ও নূর কুতবে
আলম বাংলাদেশের ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার রূপকার প্রবাদ পুরুষ। যুগ যুগে তারাই স্বাধীন মুসলিম বাঙলার সংগ্রামী সাধক আলেম সমাজের গর্বিত মুখ। আমরা যাদের উত্তরসূরী। দেওবন্দ আন্দোলন যে আইকনদের মত প্রজন্ম তৈরির জন্য নিবেদিত।

লেখক-সম্পাদক, দার্শনিক আলেমে দীন।
বহুভাষা, ইতিহাস, রাষ্ট্র ও সমাজতত্ত্ববিদ।
আহ্বায়ক, আলনূর কালচারাল সেন্টার বাংলাদেশ শাখা।

15 thoughts on “বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, উবায়দুর রহমান খান নদভী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RELAED POST