কখন ফতোয়া দেয়া ওয়াজিব এবং কখন ফতোয়া হারাম?

সম্মানীত মুফতি সাহেব ও ইফতা বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীবৃন্দ! আজ উসূলে ইফতা থেকে একটি অধ্যায় আলোচনা করব। বিষয় হচ্ছে—ফতোয়া প্রদানের নীতিমালা, কখন ফতোয়া দেয়া ওয়াজিব বা ফরজ এবং কখন ফতোয়া দেওয়া হারাম।

কখন ফতোয়া দেওয়া ওয়াজিব?
১. যখন কয়েকজন যোগ্য মুফতী থাকবে, তখন তাদের উপর ফতোয়া দেওয়া ফরযে কিফায়াহ। যদি তাদের মধ্যে থেকে কেউ এ দায়িত্ব পালন করেন তাহলে অন্যদের থেকে এ হুকুম রহিত হয়ে যাবে। নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি অবস্থায় ফতোয়া দেওয়া ফরজে আইন।

১- যদি এমন জায়গায় ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হয়, যেখানে তিনি ছাড়া অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তি নেই এবং তিনি এ মাসআলা সম্পর্কে অবগত। এ অবস্থায় ফতোয়া দেওয়া ফরযে আইন। দলিল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী :

إن الذين يكتمون ما أنزلنا من البينات والهدي… ويلعنهم اللاعنون

অর্থ : আমি মানুষের জন্য যে সব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি, কিতাবে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও যারা তা গোপন করে; সেসব লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাত কারীগণেরও। (সূরা বাকারা : ১৫৯)

২. যখন প্রশ্নকারী এমন অবস্থায় ফতোয়া জিজ্ঞেস করে যে, তাঁর তাৎক্ষণিক জবাব জানা প্রয়োজন। যদি তখন ফতোয়া না দেওয়া হয়, তাহলে নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়িত হয়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে। যেমন :
নামাযের সময় খুবই সংকীর্ণ। এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করা সম্ভব নয়; এমন মুহূর্তে কাউকে নামাজের কোনো মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো। এ দিকে মুফতী সাহেবও এ হুকুম সম্পর্কে অবগত আছেন। তাহলে তখন ফতোয়া দেওয়া ফরযে আইন। এ ব্যাপারেও পূর্বে উল্লিখিত আয়াতটিই দলিল।

৩. বাদশাহ যখন কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে মুফতি হিসেবে নিয়োগ দেবে তখন তার জন্য ফতোয়া দেয়া করযে আইন হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে দলিল হলো আল্লাহ তাআলার এই বাণী। (হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মানা কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে যারা দায়িত্বশীল তাদের।” সুরা নিসা।

ইমাম নববী রহ. বলেন, ফতোয়া প্রার্থীকে ফতোয়া দেওয়া সাধারণত ফরযে কেফায়াহ। তবে সেখানে যদি ফতোয়া দেয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি একজনই থাকেন তাহলে তার উপর ফরযে আইন হয়ে যাবে। আর যদি যোগ্য লোক অনেক থাকেন আর তাদের কোনো একজন থেকে ফতোয়া চাওয়া হয় এবং তিনি ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তাহলে কি তিনি গুনাহগার হবেন?

এ ক্ষেত্রে দুটি দিক রয়েছে। তবে স্বাভাবিক হলো, এ মাসআলাটা শিক্ষককে প্রশ্ন করার মতো। আর দ্বিতীয় দিকটি হলো, সাক্ষীদের মধ্য থেকে কোনো একজন সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে দুই সুরতের মত। সহিহ কথা হলো, গুনাহগার হবে না।’

কখন ফতোয়া দেয়া হারাম?
ইতোপূর্বে আমরা মুফতীর যোগ্যতাবিষয়ক কিছু শর্ত আলোচনা করেছি। যার মধ্যে ওই শর্তসমূহ পাওয়া যাবে এবং ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন একমাত্র তিনিই ফতোয়া দিতে পারবেন। নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি অবস্থায় একজন যোগ্য মুফতীর জন্যও ফতোয়া দেওয়া জায়েয নেই।

১. মুফতী সাহেব সর্বদিক বিবেচনায় ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য। কিন্তু জিজ্ঞাসিত বিশেষ মাসআলাটির হুকুম তার জানা নেই এবং এর জবাব বের করতেও সক্ষম হচ্ছেন না অথবা মাসআলার দলিলসমূহ তার কাছে পরিষ্কার নয় এবং তিনি কোনো একটিকে প্রাধান্য দিতেও সক্ষম হচ্ছেন না, এমতাবস্থায় এ ব্যাপারে তাঁর জন্য ফতোয়া দেওয়া জায়েয নয়।

এর দলিল হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস ‘বিচারক তিন ধরনের, একজন জান্নাতী, আর দুইজন জাহান্নামী।
জান্নাতী হলো, ওই বিচারক যিনি সত্য জেনেছেন এবং সেই অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। আর যে ব্যক্তি সত্য জানা সত্ত্বেও সে অন্যায়ভাবে রায় দিয়েছে সে জাহান্নামে যাবে। আর যে সত্য না জেনে রায় দিয়েছে সেও
জাহান্নামে যাবে। এক্ষেত্রে রায় এবং ফতোয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই। সুতরাং বিধান স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত জবাবদানে বিরত থাকা অথবা প্রশ্নকারীকে অন্য মুফতীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া ওয়াজিব।

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, যখন মিথ্যা অপবাদের বিপরীতে তাঁর নির্দোষিতার বিষয়ে ওহি নাযিল হলো, তখন আবু বকর রাখি, তার মাথায় চুম্বন করলেন। আয়েশা রাযি. বলেন, আমি তখন আবু
বকরকে বললাম, আপনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কেন আমার নির্দোষীতার বিষয় নিয়ে কথা বললেন না? তখন আবু বকর রাযি. বললেন, আমি যা জানি না সে ব্যাপারে যখন আমি কথা বলবো তখন কোন আসমান আমাকে ছায়া দেবে আর কোন জমিন আমাকে বহন করবে?

উরওয়াতুত তামীমী থেকে বর্ণিত আছে, আলী ইবনে আবী তালেব রাযি, একবার ‘কতইনা প্রশান্তিদায়ক’। কথাটি তিনবার বললেন। লোকজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এটা কেন বললেন? তিনি
বললেন, কোনো ব্যক্তিকে না-জানা বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে সে যদি বলে আমি জানি না, তাহলে এটা অনেক প্রশান্তিদায়ক।

খালেদ ইবনে আসলাম যিয়াদ ইবনে আসলাম এর ভাই- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের সাথে পথ চলছিলাম। তখন এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে আমাদের সাথে মিলিত হয়ে বলল, আপনি কি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি বলল, আমি আপনার অনুসন্ধান করছিলাম। কোনো একজন আমাকে আপনার সন্ধান দিয়েছে। আপনার কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে- ‘ফুফু কি মিরাস পাবে?’ ইবনে ওমর বললেন, আমি জানি না। তখন লোকটি বলল, আমরাও জানি না, কিন্তু আপনিও কি জানেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি জানি না। তুমি মদীনার আলেমদের কাছে যাও। তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। অতঃপর যখন সে ফিরে যেতে লাগল, তখন ইবনে ওমর তার উভয় হাতে চুমু খেয়ে বললেন, আবু আব্দুর রহমান কতইনা ভাল বলেছে। তাকে অজানা বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে আর সে তখন “আমি জানি না” বলেছে।

আবুল হাসান আলী ইবনে হাসান থেকে ইবনে আব্দুল বার নকল করেছেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে সালেহ বিন হাম্বল বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাকে আমার পিতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমাকে মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস শাফেঈ রহ. বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি মালেক ইবনে আনাসকে বলতে শুনেছি, আমি ইবনে আজলান থেকে শুনেছি তিনি বলেছেন, যখন কোনো আলেম ‘লা আদরি’ থেকে গাফেল হয়ে যাবে। সে ধ্বংস হোক।

উপর্যুক্ত সনদটি অনেক উঁচুমানের সনদ। কেননা তিনজন ইমাম পরস্পর একজন অপরজন থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ রহ. ইমাম শাফিঈ রহ থেকে। তিনি ইমাম মালেক রহ থেকে এমনিভাবে ইবনে আব্দুল বার নিজ সনদে উকাইদ বিন সালেম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি চৌত্রিশ মাস ইবনে ওমর রাযি. এর সংশ্রবে ছিলাম। অনেক সময় তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলে দিতেন ‘আমি জানি না। অতঃপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, তুমি কি তাদের উদ্দেশ্য জানো? তারা জাহান্নামে যাওয়ার জন্য আমার পিঠকে পুল বানাতে চায়।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ছাত্র আসরাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আহমদ ইবনে হাম্বলকে অনেক বেশি ‘লা আদরি’ বলতে শুনেছি। হাইসাম বিন জামীল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মালেক রহ. কে দেখেছি, তাকে আটচল্লিশটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তখন তিনি বত্রিশটি মাসআলা তে ‘لا أدري’ বলেছেন। আর কখনো তাকে পঞ্চাশটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হতো আর তিনি একটিরও উত্তর দিতেন না। তিনি বলতেন, কোনো মাসআলার উত্তর দেওয়ার আগে নিজেকে জান্নাত এবং জাহান্নামের সামনে পেশ করা উচিত।

একবার মালেক রহ.কে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন। তখন তাকে বলা হলো, এটাতো একটা সহজ মাসআলা। একথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, ইলমের কোনো কিছু সহজ নয়। সুতরাং না-জানা মাসায়েলের ক্ষেত্রে মুফতীর জন্য لا أدري বলতে লজ্জাবোধ করা জায়েয নয়।

২- মুফতি যদি মনে করে যে, সে ফতোয়াপ্রার্থীর প্রতি ঝুঁকে তাকে খুশি করার জন্য কিংবা নিজের মনগড়া ফতোয়া দিতে যাচ্ছে এবং তার প্রবল ধারণা জন্মে যে, সে ফতোয়ার বিষয়টি নিয়ে অবহেলা করছে কিংবা তার সাথে শিথীলতা প্রদর্শন করছে, তাহলে এ অবস্থায় সে ফতোয়াদান থেকে বিরত থাকবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, হে দাউদ! আমি তোমাকে দুনিয়াতে আমার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছি। অতএব, তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করবে। খেয়াল খুশির অনুসরণ করবে না। এটা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছিল। সূরা সোয়াদ।

ইমাম আহমদ রহ. এর মাযহার বিষয়ক আল ইকনা’ নামক কিতাবে আছে, মনগড়া ফতোয়া দেওয়া এবং বিচারকার্য সম্পাদন করা সকলের মতে হারাম। মুফতির জন্য ফতোয়াপ্রার্থীর বা তার প্রতিপক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

৩. মুফতী যদি এমন অবস্থার সম্মুখীন হন, যা ফতোয়ার ব্যাপারে সঠিক চিন্তা-ফিকির এবং সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে প্রতিবন্ধক হতে পারে, তাহলে এ অবস্থায় তার জন্য ফতোয়া দেওয়া জায়েয নয়। এ ব্যাপারে দলিল হলো আবু বকরা রাযি. কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘কোনো বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দু ব্যক্তির মধ্যে রায় না দেয়।

এ জন্যই ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মুফতীর জন্য যেসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত সেসবের একটি হলো, যদি তার মধ্যে ক্রোধ, ভয়, বা এমন আত্মিক অবস্থা বিরাজ করে যা তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় তাহলে এমন অবস্থায় ফতোয়া দেবে না। অনুরূপভাবে দুঃশ্চিন্তা বা বেশি আনন্দের ক্ষেত্রেও একই বিধান। অতিরিক্ত আবেগ বা ভাবপ্রকাতা যদি সঠিক চিন্তা গবেষণার ওপর প্রভাব ফেলে তাহলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা পর্যন্ত ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। এমনিভাবে যদি তন্দ্রা, ক্ষুধা, বা খুব অসুস্থতা বা অস্বস্তিকর গরম বা কষ্টদায়ক ঠাণ্ডা অথবা প্রস্রাব পায়খানার বেগ থাকে, তাহলেও অনুরূপ বিধান ।

সূত্র: উসূলে ইফতা

amarishtihar

প্রতিদিন নতুন কিছু জানুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.